কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙ্গেছে দুর্বৃত্তরা, পরে গুলি

কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙ্গেছে দুর্বৃত্তরা, পরে গুলি

কুষ্টিয়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার রাতে শহরের প্রাণকেন্দ্র এনএস রোড পাঁচ রাস্তার মোড়ে নির্মাণাধীন এই ভাস্কর্যের ডান হাত, পুরো মুখম-ল ও বাঁ হাতের অংশ বিশেষ ভেঙ্গে ফেলে দুর্বৃত্তরা। শনিবার সকালে বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হলে শহরের বঙ্গবন্ধু সুপার মার্কেট চত্বর এবং থানার মোড় এলাকায় আওয়ামী লীগ ও জাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠন প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ, মিছিল ও মানববন্ধন করে। এদিকে ভাংচুর হওয়া বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের সামনে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ফাঁকা গুলি ছুড়েছে দুর্বৃত্তরা।

জানা যায়, কুষ্টিয়া পৌরসভার উদ্যোগে গত মাসে শহরের পাঁচ রাস্তার মোড়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। ভাস্কর্যের একই বেদিদে বঙ্গবন্ধুর তিন ধরনের তিনটি ভাস্কর্য নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এছাড়া এই বেদিদে জাতীয় চার নেতার ভাস্কর্যও থাকবে। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধুর একটি ভাস্কর্য স্থাপনের কাজ প্রায় সম্পন্নের পথে। হঠাৎ করে শুক্রবার রাতে দুবর্ৃৃত্তরা এই ভাস্কর্যটির ডান হাত, পুরো মুখম-ল ও বাঁ হাতের অংশ বিশেষ ভেঙ্গে ফেলেছে বলে অভিযোগ করেন পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, ভাস্কর্য নির্মাণ কাজের প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছিল। এরই মধ্যে ভাস্কর্যের অংশ বিশেষ ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। শনিবার সকালে ঘটনাটি জানার পর জনমনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এদিকে ভাস্কর্য ভাংচুর ঘটনার প্রতিবাদে এদিন সকালে শহরের বঙ্গবন্ধু সুপার মার্কেট চত্বর এবং থানার মোড় এলাকায় জমায়েত হয় আওয়ামী লীগ ও জাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তারা এ সময় বিক্ষোভ সমাবেশ, মিছিল ও মানববন্ধন করে। সমাবেশে কুষ্টিয়া জেলা জাসদের সভাপতি হাজী গোলাম মহসিন বলেন, শুক্রবার বিভিন্ন মসজিদের জুম্মার খুৎবা পাঠকালে সারাদেশের ভাস্কর্য অপসারণের যুক্তি দিয়ে মসজিদে আগত ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের উস্কে দেয়া হয় বলে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। তারা দেশের ধর্মপ্রতিষ্ঠান মসজিদ মাদ্রাসায় আগত ধর্মপ্রাণ মানুষকে উস্কে দিয়ে সর্বশেষ মহান স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ধ্বংস ও উচ্ছেদের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। এছাড়া সমাবেশে শ্রমিক লীগ নেতা আমজাদ হোসেন, যুবজোট নেতা মাহাবুল হোসেন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। ভাস্কর্য ভাংচুর ঘটনায় এক প্রতিক্রিয়ায় কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের এমপি ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, এ ধরনের নোংরা কাজ কোনভাবেই মেনে নেয়া হবে না। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে এবং মদদ দিয়েছে তাদের প্রত্যেককেই খুঁজে বের করে কঠিন শাস্তি দিতে হবে। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগার আলী বলেন, স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি যারা এই দেশকে বিশ্বাস করে না, বঙ্গবন্ধুকে ভালবাসে না সেই অশুভ মৌলবাদী চক্র ছাড়া এই কাজ আর কেউ করতে পারে না। বিজয়ের এই মাসে যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আঘাত করেছে তাদের অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, স্বাধীনতা বিরোধীদের এ দেশে কোন স্থান নেই। তাদের এ দেশ থেকে বিতাড়িত করতে হবে। পৌরসভার মেয়র আনোয়ার আলী বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, যারা আওয়ামী লীগের বিরোধী, বঙ্গবন্ধুকে যারা মানতে পারে না তারাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে। পৌরসভার পক্ষ থেকে পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। এ ব্যাপারে থানায় মামলা করা হচ্ছে। এদিকে এই ভাস্কর্যের ভাস্কর মাহাবুব জামান শামীম জানান, তারা দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণে বিভিন্ন ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। এ কারণে সবসময় তাদের একটি মহলের চাপে থাকতে হয়। কুষ্টিয়ার এই ভাস্কর্যটি ছিল বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের প্রতীক। যারা এই ভাস্কর্যটি ভাংচুরের মতো দুঃসাহস দেখিয়েছে তাদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানান এই ভাস্কর্য শিল্পী। সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন কুষ্টিয়া শাখার সাধারণ সম্পাদক কারশেদ আলম জানান, এটি খুবই গর্হিত অপরাধ। মৌলবাদী অপশক্তি এসব করে দেশে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। এদের সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান কারশেদ আলম। কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এসএম তানভির আরাফাত জানান, ঘটনাস্থলে থাকা সিসি টিভির ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। তাতে রাত ২টার দিকে দুইজনকে দেখা যাচ্ছে যারা ভাস্কর্য ভাংচুর করছে। জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে। শীঘ্রই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি সংবাদিকদের বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের এই বিজয় মাসে জাতির জনক ও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। রাতের আঁধারে যারাই এই ভাস্কর্য ভাংচুরের সঙ্গে জড়িত থাক তাদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। ঘটনার পরপরই জেলার সবগুলো ভাস্কর্যে অতিরিক্ত নজরদারি শুরু হয়েছে। কালেক্টরেট চত্বরসহ জেলায় যতগুলো ভাস্কর্য আছে সবগুলো সিসি ক্যামেরার আওতায় নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট ইউএনওদেরও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

ভাংচুর করা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের সামনে গুলি ॥ কুষ্টিয়ায় ভাংচুর হওয়া বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের সামনে এবার ফাঁকা গুলি ছুড়েছে দুর্বৃত্তরা। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে শহরের ব্যস্ততম পাঁচ রাস্তা মোড়ে ভাস্কর্য স্থানে এক যুবক একটি মাইক্রোবাস যোগে এসে সেখানে পুলিশের উপস্থিতিতে পিস্তল উঁচিয়ে দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে দ্রুত মজমপুর গেট হয়ে চৌড়হাঁসের দিকে পালিয়ে যায়। পরে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এ ঘটনা সেখানে উপস্থিত পুলিশ লাইন্সের উপপরিদর্শক (এসআই) মকছেদুর রহমান সরাসরি প্রত্যক্ষ করেন। তবে তিনি তাদের আটকাতে পারেননি। এসআই মকছেদুর বলেন, বেলা তিনটার দিকে তিনি ভাস্কর্যের সামনে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে আসেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সেখানে একটি নোয়াহ মাইক্রো গাড়ি আসে। ওই গাড়ির ভেতর থেকে ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। গাড়িটিতে কোন নম্বর প্লেট ছিল না। সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়। কুষ্টিয়া শহরের পাঁচ রাস্তার মোড়ে পৌরসভার তত্ত্বাবধানে ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে বঙ্গবন্ধুর তিনটি ভাস্কর্য নির্মাণ করা হচ্ছে। এর একটির কাজ প্রায় শেষের দিকে। এরই মধ্যে শুক্রবার রাত দুইটার দিকে বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য ভাংচুর করে দুর্বৃত্তরা। পুলিশ ও কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, রাত সাড়ে সাতটার দিকে একটি নোয়াহ গাড়ি, যার নম্বর প্লেট ছিল না। গাড়িটি বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য ঘিরে দুবার ঘুরে গ্লাস বের করে একজন ফাঁকা গুলি ছোড়েন। এরপর তারা দ্রুত মজমপুর এলাকার দিকে চলে যান। ঘটনার পরপরই ব্যস্ততম ওই এলাকার লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম বলেন, ‘কে বা কারা করেছে, সেটি তদন্ত চলছে’। এদিকে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাংচুরের ঘটনার পর কুষ্টিয়া শহরজুড়ে এখন থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

নোয়াখালীতে মানববন্ধন ॥ নিজস্ব সংবাদদাতা নোয়াখালী জানান, মুজিব জন্মশতবর্ষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতার প্রতিবাদে নোয়াখালীতে মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করা হয়েছে। শনিবার শেষ বিকেল সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট নোয়াখালী শাখার উদ্যোগে জেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা, কবি, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের অংশগ্রহণে এ মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করা হয়। মানববন্ধন চলাকালে জাতীয় কবিতা পরিষদ নোয়াখালীর সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন আরমানের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি বিমেলেন্দু মজুমদার, সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন কৈশোরসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা। এ সময় বক্তারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের শুভক্ষণে মৌলবাদী গোষ্ঠী আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার অপচেষ্টা করছে। তারা জাতির জনকের স্মরণে নির্মিত ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা করছে। যা বাঙালী জাতি হিসেবে আমাদের জন্য খুবই অসম্মানের। আমরা মৌলবাদী গোষ্ঠীকে হুঁশিয়ার করছি, স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ হবে, স্থাপিত হবে। যারা এর বিরোধিতা বা কোন ধরনের অপচেষ্টা করবে তাদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়া হবে।

সিরাজগঞ্জে প্রতিবাদ মিছিল ॥ স্টাফ রিপোর্টার সিরাজগঞ্জ জানান, কুষ্টিয়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ভাস্কর্য ভাংচুরের প্রতিবাদে সিরাজগঞ্জের মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় থেকে এক প্রতিবাদ বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলকারীরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ভাস্কর্য ভাংচুরের সঙ্গে উগ্র মৌলবাদীরা জড়িত জানিয়ে তাদের বিরুদ্ধে নানাবিধ স্লোগান দেয়।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2019 doinikprovateralo.Com
Desing & Developed BY Md Mahfuzar Rahman