দেড় হাজার বাংলাদেশী পাচার চক্রের ফাঁদে

দেড় হাজার বাংলাদেশী পাচার চক্রের ফাঁদে

দালালদের খপ্পরে পড়ে প্রতি বছর আফ্রিকার লিবিয়া, ইউরোপ, আমেরিকাসহ যাওয়ার প্রলোভনে কয়েকটি দেশে মানব পাচারকারীদের শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশীরা। এরমধ্যে কিছু মানুষ স্বপ্নের দেশে পা রাখতে পারলেও বাকিদের ভাগ্যে নেমে আসছে নির্মম নির্যাতন। তারপরও দেশ থেকে প্রতি বছরই শত শত মানুষ স্বপ্নের দেশগুলোতে পাড়ি জমাতে অবৈধ পথকেই বেছে নিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কেউ ট্রলারে করে, কেউ জঙ্গলে রাত কাটিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে, আবার কেউবা ঢাকা থেকে আকাশপথে মধ্যবর্তী কোনো দেশে গিয়ে সেখান থেকে গন্তব্য দেশের উদ্দেশ্য পাড়ি জমাচ্ছেন। এ সময় অনেকের স্বপ্ন পূরণের আগেই অকাল মৃত্যু হচ্ছে পথে। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তাদের লাশও।

সর্বশেষ মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর ও ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটের উদ্ধৃতি দিয়ে অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বেসরকারি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, গত ২১ মাসে জঙ্গলপথে ইটালি পাড়ি জমানোর উদ্দেশ্যে অন্তত দেড়হাজার বাংলাদেশী মানবপাচারকারীদের ফাঁদে পড়ে। এর আগে অবৈধভাবে দেশটিতে (ইটালি) পাড়ি জমাতে গিয়ে লিবিয়ার মিজদা শহরে ৩০ জন অভিবাসীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। যাদের মধ্যে ২৬ জন বাংলাদেশী আর চারজন সুদানি নাগরিক। এ সময় দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হন আরো ১১ বাংলাদেশী।

অভিবাসীদের নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রামরুর প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে জঙ্গলপথে মানবপাচারের বিষয়ে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে বসনিয়া-হার্জেগোভিনার জঙ্গলে এবং পরিত্যক্ত ভবনে অভিবাসন প্রত্যাশী ৫০০ জন আটককৃতদের মধ্যে ৩০০ জনই ছিলেন বাংলাদেশী। ক্রোয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী ভেলিকাক্লাসুদা শহরের কাছের জঙ্গলে আটকে থাকা এসব অভিবাসন প্রত্যাশীর শেষ গন্তব্য ছিল ইতালি। প্রচণ্ড শীতে গাছের সাথে পলিথিন বেঁধে পাহাড়ের ঢালে বানানো তাঁবুতে গাদাগাদি করে তারা অবস্থান করছেন। সেখানে নেই পর্যাপ্ত খাবার ও জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা। বসনিয়া ও অস্ট্রিয়ার কূটনৈতিক সূত্র এবং ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে অন্তত দেড় হাজার বাংলাদেশী মানব পাচারকারীদের ফাঁদে পড়ে বলকানের দেশ বসনিয়া হার্জেগোভিয়া, সার্বিয়া, স্লোভেনিয়া আর ক্রোয়েশিয়াতে গিয়ে পৌঁছান। বসনিয়াতেই গেছেন ১৩০০ জন।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালের জুলাইয়ে মেসিডোনিয়ায় গ্রিস সীমান্তের কাছে ট্রাক থেকে ২১১ জন অভিবাসীকে পুলিশ উদ্ধার করে যাদের মধ্যে ১৪৪ জনই বাংলাদেশী। একই বছরের সেপ্টেম্বরে স্লোভেনিয়াতে অবৈধভাবে প্রবেশের জন্য গ্রেফতারকৃত ১১৩ জন অভিবাসীর মধ্যে ৫২ জন ছিলেন বাংলাদেশী। বসনিয়ার সরকারি হিসাব মতে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত অভিবাসনপ্রত্যাশীর সংখ্যা প্রায় আট হাজার এবং বাংলাদেশীর সংখ্যা সেখানে দুই হাজার ৫৫৩ জন। এই সংখ্যা ২০১৯ সালে বসনিয়ার বাংলাদেশী অভিবাসন প্রত্যাশীদের তিনগুণেরও বেশি (৭৮২)। অস্ট্রিয়া ও নেদারল্যান্ডসের কূটনৈতিক সূত্র মতে, ভূমধ্যসাগর দিয়ে মানবপাচারের পথ দুরূহ হওয়ায় বলকানের দেশগুলোতে মানবপাচারের সাথে জড়িত অন্যান্য অপরাধ যেমন শ্রমদাস, মুক্তিপণ দাবি, নির্যাতন ইত্যাদিও ঘটতে শুরু করেছে। ২০২০ সালের জুলাইয়ে ১৩ বাংলাদেশীকে ইতালি পাচারের অভিযোগে বসনিয়ার কোস্তানিকা শহর থেকে তিন মানবপাচারকারীকে এবং সেপ্টেম্বরের শেষে জেনিয়া শহর থেকে একজন স্থানীয় নাগরিককে পাঁচ বাংলাদেশীকে পাচারের অভিযোগে আটক করা হয়। শুধু ইউরোপের দেশ ইটালিতে বাংলাদেশীদের পাচারের জন্য জঙ্গলের পথ ব্যবহৃত হচ্ছে তা কিন্তু নয়, আদম পাচারকারী চক্রের বিশাল নেটওয়ার্কের সদস্যরা ঢাকা-দুবাই-মিসর আকাশপথে নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে সড়ক পথে পাচার করছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ লিবিয়াতে।

গতকাল মিসরে স্থায়ীভাবে বসবাসরত একজন বাংলাদেশী ব্যবসায়ী নাম না প্রকাশের শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, ২০২০ সালে লিবিয়ার মিজদা শহরে ইতালিগামী বাংলাদেশীদের পাচারের সময় যে ২৬ বাংলাদেশী গুলিতে মারা যান তাদেরকে মিসর থেকেই দালালচক্র লিবিয়াতে নিয়ে গিয়েছিল। তিনি জানান, এখনো অবৈধপথে ঢাকা থেকে মিসর হয়ে যেসব বাংলাদেশীকে লিবিয়াতে পাঠানো হচ্ছে সেই চক্রের সদস্যরা বাংলাদেশী নাগরিক। তাদের বিষয়ে দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাস কিছুটা অবহিত থাকলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন। ঢাকা থেকে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি বা সরকারের কোনো সংস্থা মিসর এসে তদন্ত করলেই মানবপাচারের সাথে কারা কারা জড়িত তা বের হয়ে আসবে। তবে করোনার কারণে আদম পাচারকারী চক্রের সদস্যরা ইদানীং ঘাপটি মেরে রয়েছে বলে জানান তিনি।

এ দিকে রামরুর গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালের জুন মাসে লিবিয়ার মিজদা শহরে যে ৩০ অভিবাসীকে গুলি করে হত্যা করা হয় তাদের মধ্যে ২৬ জনই ছিলেন বাংলাদেশী। বাকি চারজন সুদানের। আহত হন ১১ জন। নিহত মানব পাচারকারী ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটান। এই হত্যাকাণ্ডের মাত্র পাঁচ মাস আগে তারা ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়ে ছিলেন এবং লিবিয়ার বেনগাজি থেকে ত্রিপোলি হয়ে ইউরোপ যাত্রার পথে তারা দুই দফা অপহরণকারীদের হাতে জিম্মি হন। ২০২০ সালের আগস্ট মাসে লিবিয়ায় মানবপাচারকারী চক্রের বন্দিশালায় ২৮ জন বাংলাদেশী অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার খবর পাওয়া যায়। পাচার হওয়া অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বন্দিশালায় রেখে শারীরিক নির্যাতন করা হয় এবং এসব ঘটনার ভিডিও ও কান্নার শব্দ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দেশে অবস্থানরত পরিবারের সদস্য এবং আত্মীয়স্বজনকে শুনিয়ে চুক্তির টাকাসহ অতিরিক্ত অর্থ মুক্তিপণ হিসেবে নেয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, মানবপাচার চক্রের সাথে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেরও কিছু কর্মকর্তা কর্মচারী কোনো না কোনোভাবে জড়িত রয়েছেন। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ডেস্ক ছাড়াও অন্যান্য বিভাগের দিকে কঠোর নজরদারি বাড়ানো সম্ভব হলে মানবপাচারের ঘটনা অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশ্লেষকরা।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2019 doinikprovateralo.Com
Desing & Developed BY Md Mahfuzar Rahman