ফল উৎপাদন শিখতে বিদেশ সফরে ব্যয় ১০ কোটি টাকা

ফল উৎপাদন শিখতে বিদেশ সফরে ব্যয় ১০ কোটি টাকা

কারিগরি প্রকল্প ছাড়াও এখন যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশ সফর বা বিদেশ প্রশিক্ষণ অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি অর্থ খরচ করে কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর বেড়েই চলেছে। পুকুর খনন, খাল খনন, সিডর প্রকল্পে বিদেশ সফরের পর এখন ফল উৎপাদন শিখতে বিদেশ সফর করা হচ্ছে বিরাট অর্থ ব্যয় করে। ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশ সফর এবং প্রশিক্ষণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ কোটি ১০ লাখ টাকা। পাঁচ বছরের প্রকল্প এখন সময় বৃদ্ধি পেয়ে আট বছরে দাঁড়িয়েছে। আর দু’দফায় ব্যয় বাড়ছে ২৬৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা বা ১৩৬ শতাংশ। নতুন করে ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবনা আজ মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) অনুমোদনের জন্য পেশ করা হচ্ছে। পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, সরকারি অর্থ ব্যয় করে কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ করি। অনেকসময় পুকুর খনন শিখতে উগান্ডায় যাচ্ছি; কিন্তু কেন?

প্রস্তাবনার তথ্য থেকে জানা গেছে, ফল উৎপাদন ও সংরক্ষণে রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারের কারণে মানুষ যা খাচ্ছে তা থেকে কোনো সুফল পাচ্ছে না। উল্টো ক্ষতির শিকার হচ্ছে বলে পুষ্টিবিদরা বলছেন। কৃষিপ্রধান দেশ হলেও এ দেশে মানুষের দৈনিক ফল খাতে পুষ্টি ঘাটতি ৬১ শতাংশ বা ১২২ গ্রাম। আর এই চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে পুষ্টিঘাটতি পূরণের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে সরকার। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২৫ কোটি টাকার বেশি প্রকল্পে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। সেই সমীক্ষা না করেই প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তি সত্ত্বেও ২০১৫ সালে ১৯৫ কোটি টাকায় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন দেয়া হয়। এর পরে আবারো ব্যয় ১০৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা এবং মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে প্রথম সংশোধন করা হয়। সে অনুযায়ী, ২০২১ সালের জুনে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ৮০ শতাংশ। এখন আবার ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এই ব্যয় ১৬১ কোটি টাকা বা ৫৩.৮২ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। আর মেয়াদ আরো দুই বছর।

জানা যায়, দেশব্যাপী উদ্যান ফসলের সেবা চাষিপর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে ৪৫টি জেলায় বিদ্যমান ৬০টি হর্টিকালচার সেন্টারের আধুনিকায়ন এবং ৯টি নতুন হর্টিকালচার সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশের ৪৫ জেলার ৩৬২টি উপজেলায় এটি বাস্তবায়ন করা হবে। ঢাকায় ১০৩টি, চট্টগ্রামে ৭৯টি, সিলেটে ১৯টি, রাজশাহীতে ৭১টি, রংপুরে ৩৫টি, খুলনায় ৩১টি এবং বরিশালের ২৪টি উপজেলায় বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পের মাধ্যমে এক লাখ ৬৫ হাজার কৃষাণ-কৃষাণী ও ফল ব্যবসায়ী, ৯০০ মালি, ৩০ হাজার গৃহিণী, নবম ও দশম শ্রেণীর ৩০ হাজার স্কুলগামী বালিকাকে পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

প্রকল্পের ব্যয় পর্যালোচনা থেকে দেখা যায়, মূল প্রকল্প ব্যয় প্রাক্কলন করা হয় পিডব্লিউডির ২০১৪ সালের রেট শিডিউল অনুযায়ী। এরপর এখন ২০১৮ সালের রেট শিডিউল ধরে অসমাপ্ত কাজের জন্য নতুন করে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। মূল প্রকল্পে বিদেশে কর্মশালা বা কোর্স করার জন্য এক কোটি ৫১ লাখ টাকা ধরা হয়। এখন এই খাতে ব্যয় দুই কোটি ৬৯ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। বিদেশে শিক্ষাসফর খাতে প্রথমে ব্যয় ধরা হয় পাঁচ কোটি পাঁচ লাখ টাকা। এখন বাড়িয়ে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে ছয় কোটি ৯০ লাখ টাকা। এখানে প্রায় দুই কোটি টাকার মতো বাড়ানো হয়েছে। আর নারিকেল হাইব্রিডাইজেশনের জন্য বিদেশে প্রশিক্ষণ নিতে খরচ ধরা হয় ৫০ লাখ টাকা। প্রথম ওই ব্যয় দু’জনের জন্য ছিল। এখন এটা ১০ জনের জন্য। উদ্বুদ্ধকরণ ভ্রমণে ব্যয় হবে এক কোটি ২০ লাখ টাকা, যা ছিল ৮০ লাখ টাকা। জ্বালানি খাতে ব্যয় ছিল আট কোটি টাকা, এটা বাড়িয়ে ১০ কোটি ৩০ লাখ টাকা করা হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশে প্রায় ৭০ রকমের ফল জন্মে। দেশীয় ফল অনেক বেশি পুষ্টিসমৃদ্ধ; কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম উৎপাদন হয়। আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস-১১) তথ্যানুযায়ী, প্রতি বছর এ দেশে তিন লাখ ৪৮ হাজার হেক্টর জমিতে ৪৩ লাখ ৮০ হাজার টন ফল এবং চার লাখ ৫২ হাজার হেক্টর জমিতে ৩০ লাখ ৬০ হাজার টন সবজি উৎপাদিত হয়। আমাদের দৈনিক ফল খাওয়া দরকার ২০০ গ্রাম; কিন্তু বাস্তবে খাওয়া হচ্ছে মাত্র ৭৮ গ্রাম; যা চাহিদার তুলনায় মাত্র ৩৯ শতাংশ। কম খাওয়ার মূল কারণ হলো চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ব্যবধান। এই প্রকল্পের মাধ্যমে উদ্যান ফসলের উৎপাদন প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ৫০ শতাংশ জনগণ উদ্যান ফসল উৎপাদন, ব্যবহার, রাসায়নিক মুক্ত ফলের প্রাপ্যতা, সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, প্রক্রিয়াজাতকরণ ইত্যাদি বিষয়ে দক্ষ জনবল তৈরি করা হবে। বর্তমানে দেশের ১৯টি জেলায় কোনো হর্টিকালচার সেন্টার নেই।

পুষ্টিবিদরা বলছেন, সাম্প্রতিক কালে দেখা যাচ্ছে অধিক মুনাফার লোভে অপরিপক্ব ফল পাকানোর জন্য রাসায়নিক দ্রব্য যেমন ফরমালিন, কার্বাইড, ইথিনসহ অন্যান্য রাসায়নিকের অপব্যবহার করা হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এমনকি মানবদেহে নতুন নতুন অনেক রোগের জন্ম নিচ্ছে।

বিদেশ সফর সম্পর্কে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, আমরা দেখতে পাচ্ছি, তিন দিনের স্টাডি ট্যুরে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা আমেরিকায় যাচ্ছেন। আমেরিকায় যেতে আসতেই লাগে দুই দিন। তাহলে ওই তিন দিনের ট্যুরে আমেরিকায় গিয়ে আমরা কী শিখছি? তবে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানোর নামে আমরা যা করি এগুলোও মানুষের নজরে থাকে, এটা আমাদের মনে রাখা উচিত।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2019 doinikprovateralo.Com
Desing & Developed BY Md Mahfuzar Rahman