বঙ্গবন্ধু হত্যায় দেশ হাজার ধাপ পিছিয়েছে : রাশেদ খান মেনন

বঙ্গবন্ধু হত্যায় দেশ হাজার ধাপ পিছিয়েছে : রাশেদ খান মেনন

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন। সম্প্রতি সমকালকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন অমরেশ রায়।

সমকাল :বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দেখার স্মৃতি বলবেন? শেষ কবে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়?

রাশেদ খান মেনন :বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রথম দেখি ‘৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনের মিছিল থেকে। তিনি তখন ঢাকার জিন্নাহ অ্যাভিনিউয়ে একটি ইন্স্যুরেন্সে কাজ করতেন। অফিসের জানালা দিয়ে মিছিলের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু হাত নেড়েছিলেন। আর সর্বশেষ দেখা হয় ১৯৭৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। বাকশাল নিয়ে আলোচনার জন্য রনো (হায়দার আকবর খান রনো) ও আমাকে বাসায় ডেকেছিলেন তিনি। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বাড়ির লাইব্রেরি কক্ষে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের লাইব্রেরি) বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাদের এক ঘণ্টা কথা হয়েছিল।

সমকাল :১৫ আগস্টের কিছু স্মৃতি বলবেন? কেন এমন পটভূমি তৈরি হয়েছিল বলে আপনি মনে করেন?

মেনন :১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে আমার শ্বশুর বিবিসির খবর শুনে এসে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কথা জানান। রেডিও চালু করলে মেজর ডালিমের বক্তব্য শুনতে পাই- ‘বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হলো’। তখনই আমরা বুঝে ফেলি- মুক্তিযুদ্ধের পথ থেকে এক, দুই, ১০ না; হাজার ধাপ পিছিয়ে গেল বাংলাদেশ।

১৫ আগস্ট তৈরির পটভূমি ছিল- প্রথমত, বাকশাল। এতে আইনিভাবে দেশে রাজনৈতিক দল ছিল না, যা সবাইকে বিক্ষুব্ধ করেছিল। দ্বিতীয়ত, বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মসূচি আমলাতন্ত্র এবং প্রশাসনযন্ত্রকে আঘাত করেছিল। ফলে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরই সব উল্টে যায়। কোথাও কোনো ধরনের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ কিংবা বিক্ষোভ পর্যন্ত দেখা যায়নি।

সমকাল :১৫ আগস্ট ষড়যন্ত্রে দেশি-বিদেশি অপশক্তির কার কী ভূমিকা ছিল?

মেনন :এটি সবারই জানা। কর্নেল রশিদ ও ফারুক ১৯৭২ সাল থেকেই পরিকল্পনা করছিল। ‘৭৩ সালে তারা ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে যোগাযোগ করে। এ থেকে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রও স্পষ্ট। পরে জেনারেল জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে রশিদ এবং ফারুক পরিকল্পনা জানায়। জিয়া তাদের বিরত রাখার চেষ্টা করেননি। বরং তিনি তাদের বলেন, ‘জুনিয়ররা এটা করলে তোমরা চালিয়ে যাও। আমাদের সিনিয়রদের জড়িও না।’ জিয়া নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রেখে এটি কার্যকর করেছিলেন। অন্যদিকে, সে সময়ে অন্যান্য সেনা-কর্মকর্তা যাঁরা ছিলেন, তাঁরাও বঙ্গবন্ধু হত্যাকে সমর্থন এবং মোশতাক সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। আসলে বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়াসহ জুনিয়র অফিসারদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর ওপরতলার অফিসারদের ঐকমত্য হয়েছিল। এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে মোশতাক, শাহ মোয়াজ্জেম, তাহের ঠাকুর, কেএম ওবায়দুর রহমানসহ অন্যরা জড়িত ছিলেন। এমনকি বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্যরাও লাশ সিঁড়িতে রেখে মোশতাকের মন্ত্রিসভায় শপথ নেন। পরোক্ষভাবে তাঁরাও এটিকে অনুমোদন করেন কিংবা যুক্ত হয়েছিলেন।

সমকাল :এই ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় রাজনীতিকদের কোনো ব্যর্থতা ছিল?

মেনন :বাকশাল হওয়ায় তৎকালীন রাজনীতিতে বাদ-বাকি দলের কারও কোনো ভূমিকা ছিল বলে মনে হয় না। ফলে ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় রাজনীতিকদের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্নের সুযোগ খুব একটা নেই।

সমকাল :১৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রভাব কী?

মেনন :বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রথম থেকেই দেশকে ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত করা, এমনকি ইসলামিক রিপাবলিক ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়। যদিও পরে এ উদ্যোগ থামানো হয়। বাংলাদেশ বেতার হলো রেডিও বাংলাদেশ। জয় বাংলা স্লোগান করা হলো বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। সংবিধান সংশোধন করে ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের সংজ্ঞা পরিবর্তন হলো। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি পুনর্বাসনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সব অর্জন ধ্বংসের পথ উন্মুক্ত করা হয়।
সমকাল :টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজ কতটা এগোলো?

মেনন :বঙ্গবন্ধু শোষিতের মুক্তির রাজনীতির কথা বলতেন। এখন রাষ্ট্রে সম্পদ ও আয়ে বৈষম্য বিদ্যমান। এতে ওপরতলার মুষ্টিমেয় লোকের হাতে সব সম্পদ ও ক্ষমতা। যে পরিস্থিতি চলছে; বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে তিনিও এর বিরুদ্ধে লড়াই করতেন। বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আমার পরামর্শ হলো- বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শ ভালোভাবে অনুধাবন করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। আওয়ামী লীগ তা না করলে মোশতাকের আওয়ামী লীগে পরিণত হবে।

সমকাল :বঙ্গবন্ধু হত্যারহস্য উদ্ঘাটনে স্বাধীন কমিশন গঠন করতে বলেছেন আদালত। প্রধানমন্ত্রীও একাধিকবার বলেছেন। এর পরও কেন কমিশন গঠন হচ্ছে না বলে আপনি মনে করেন?

মেনন :এখানে অভ্যন্তরীণ ও বাইরের প্রশ্ন জড়িত। হয়তো বঙ্গবন্ধু হত্যা সেনাবাহিনীতে যে ক্ষত তৈরি করেছে; বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা খুঁচিয়ে সেটি না জাগিয়ে প্রলেপ দিতে চাইছেন। কারণ, তৎকালীন সেনাপ্রধান, সেনা-কর্মকর্তাসহ অনেকেই পরে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন। আর যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটনে গেলে দেশটির সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হবে কিনা- সে প্রশ্নও রয়েছে। সব দিক বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী সময় নিচ্ছেন।

সমকাল :’৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতি পুনরুদ্ধার কি কখনও সম্ভব?

মেনন :’৭২-এর চার মূলনীতি সংবিধানে পুনঃস্থাপন হলেও মর্মার্থ অনুসারে ফেরেনি। বিশেষ করে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম চার মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমনকি সংবিধানের ৩৬ ধারায় ধর্মভিত্তিক দলকে রাজনীতিতে সুযোগ দেওয়ার বিষয়ও মূলনীতির সঙ্গে যায় না। এটি করার সময় আমরা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছি। অবিকৃত চার মূলনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা লম্বা লড়াইয়ের ব্যাপার। সেই লড়াই কখন পরিণতি পাবে- এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। আওয়ামী লীগ বর্তমান চরিত্র পাল্টালে তাদের পক্ষেও বাস্তবায়ন সম্ভব। এটি বঙ্গবন্ধুকন্যা করলে ভালো; না হলে নতুন প্রজন্মই এর সমাধান করবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2019 doinikprovateralo.Com
Desing & Developed BY Md Mahfuzar Rahman