বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ছে আমেরিকার

বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ছে আমেরিকার

নানা কারণে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়েছে। এটি আচমকা নয় বরং ধারাবাহিক যোগাযোগের ফল- বলছেন কূটনীতিকরা। তাদের মতে, এবার তা দৃশ্যমান অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক রূপ পেতে চলেছে। পেশাদার কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা-ওয়াশিংটন ঘনিষ্ঠতার নেপথ্যে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা। বাংলাদেশে চীনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ কিংবা ভারতের প্রভাব বলয় অক্ষুণ্ন রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতার ধারণাও (পারসেপশন) কূটনৈতিক মহলে বেশ চাউর আছে। কিন্তু ঢাকার পেশাদাররা এর সঙ্গে ভিন্ন প্রেক্ষিত যুক্ত করার চেষ্টা করেন। তাদের মতে, কূটনীতিতে জাতীয় স্বার্থই অগ্রাধিকার। বৃহৎ পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্বতা রয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির অনেক ইস্যু। শুধু তাই নয়, গোটা এশিয়া অঞ্চল নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা বিবেচনা রয়েছে। ভারত বা অন্য কারও ‘প্রক্সি’ দেয়ার সময় বা অবস্থানে অন্তত যুক্তরাষ্ট্র থাকার কথা নয়। তথাপি ‘ধারণাগত তত্ত্ব’কে একেবারে উড়িয়ে না দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের পরিচর্যাকারী এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক গতকাল মানবজমিনের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলাপে বলেন, ১৯৯২ সালে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে ব্যুরো অফ সাউথ অ্যান্ড সেন্ট্রাল এশিয়ান অ্যাফেয়ার্স প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি মূলত ওই বিভাগই দেখভাল করে। ব্যুরো প্রধান অর্থাৎ এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট (সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী) পর্যায়ে ছিল বাংলাদেশের ফোকাস। আর এ কারণেই কূটনীতিক এডওয়ার্ড দজেরেজিন, পাকিস্তান এক্সপার্ট মিজ রবিন রফেল, কূটনীতিক কার্ল ফ্রেডরিক ইন্ডফুর্থ, নিরাপত্তা বিশ্লেষক কাম কূটনীতিক ক্রিস্টিনা বি রোকা, পেশাদার কূটনীতিক রবার্ট ও ব্লেইক জুনিয়র, পলিটিক্যাল অ্যাপয়েন্টি নিশা দেশাই বিসওয়াল, উইলিয়াম ই টড-এর নাম বাংলাদেশে বহুল পরিচিত। ঢাকার ওই কর্মকর্তার মতে, গত ক’বছরে স্টেট ডিপার্টমেন্টের দক্ষিণ এশিয়া ব্যুরো ছাড়াও পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স, ইকোনমিক, বিজনেস অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল অ্যাফেয়ার্স এবং পাবলিক ডিপ্লোমেসি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট পর্যায়ে বাংলাদেশের যোগাযোগ নিবিড় হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ফোকাস বা গুরুত্বে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। আর এ কারণে সেক্রেটারি অব স্টেট বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও’র পরবর্র্তী অবস্থানে থাকা (স্টেট ডিপার্টমেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদধারী) উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বাইগান বাংলাদেশ সফর করতে আসছেন। আগামী ১৪ই অক্টোবর তার ঢাকা পৌঁছানোর কথা। তার আগে তিনি নয়াদিল্লি সফরে ৩ দিন কাটাবেন। স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্রের দপ্তর গত শুক্রবার এক মিডিয়া নোটে যুগল ওই সফরের বিস্তারিত কর্মসূচি প্রচার করেছে। ঢাকার তরফেও বাইগানের সফরের বিষয়টি মানবজমিনকে নিশ্চিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, করোনার মধ্যেই মার্কিন ডিপার্টমেন্টের নাম্বার টু পজিশনধারী স্টিফেন বাইগান ঢাকা সফরে আসছেন। সঙ্গত কারণেই সফরটির বাড়তি গুরুত্ব রয়েছে। তার সফরে দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্বের ক্রুসিয়াল অনেক ইস্যু আলোচনা হবে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের কী পয়েন্ট অর্থাৎ নির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা বাইগানের সফর ঢাকার সঙ্গে ওয়াশিংটনের সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার আলামত হিসাবে বিবেচ্য। দিল্লির চোখে বাংলাদেশকে ওয়াশিংটন এখন আর দেখে না মর্মে সাম্প্রতিক সময়ে যে বার্তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, অত্যাসন্ন সফরটি তারই ইঙ্গিত। মার্কিন মিডিয়া নোট মতে, ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট বাইগান ১৬ই অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে থাকছেন। সফরকালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের সিনিয়র নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সিরিজ বৈঠকে মিলিত হবেন। সেগুনবাগিচা এবং ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের রিপোর্ট মতে, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার সফর ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে অন্তত ৩ জন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় পূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সফর করেছেন। কিন্তু কোনো উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটাই সম্ভবত প্রথম সফর হবে। ওই সফরে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যকার অংশীদারি সম্পর্কের নানা দিক ও বিভাগ নিয়ে আলোচনা হবে। নোট মতে, বাইগানের ঢাকার এনগেজমেন্টে সবার সমৃদ্ধির জন্য প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবিত অবাধ, মুক্ত, সমন্বিত, শান্তিপূর্ণ এবং নিরাপদ ইন্দো-প্যাসিফিক রিজিওন প্রতিষ্ঠার যে প্রয়াস, যা বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের কমন ভিশন, তা এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা হবে। করোনা পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠেয় হাই প্রোফাইল ওই সফরে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে আরো ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারে তা নিয়ে কথা হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের নানা দিক ও চ্যালেঞ্জ প্রশ্নে পারস্পরিক সহযোগিতা কতটা বাড়ানো যায় তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। উল্লেখ্য, ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের বিশাল টিম থাকার পরও বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারকরণে এখানে ফরেন কমার্শিয়াল সার্ভিস অফিস খুলছে যুক্তরাষ্ট্র। এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নীতি নির্ধারকদের বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। ওয়াশিংটনের ওই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে ঢাকা। গত ৩০শে সেপ্টেম্বর সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বিষয়ক ভার্র্চ্যুয়াল বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি ও পরিবেশ বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি কিথ ক্র্যাখ এবং বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এমপি। ওই বৈঠকে যেসব আলোচনা হয়েছে তার একটি যৌথ বিবৃতি প্রচার করেছে স্টেট ডিপার্টমেন্টে মুখপাত্রের দপ্তর। বিবৃতিতে ঢাকা-ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্য বিষয়ক যৌথ বিবৃতিতে মোটা দাগে মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে অঙ্গীকারের বিষয়টি ফোকাস করা হয়। এতে বলা হয়, নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসটিডিএ এবং দেশটির এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ ও চুক্তির জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ উভয়েরই মুক্ত ও নিরাপদ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের স্বপ্ন রয়েছে উল্লেখ করে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, এরমধ্য দিয়ে পারস্পরিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ঢাকা-ওয়াশিংটন একত্রে কাজ চালিয়ে যাবে। ওই বৈঠকে কোভিড-১৯ এর প্রেক্ষিতে টেকসই সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি ও অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জোর দেয়া হয়। একই সঙ্গে নিরাপদ অর্থনীতির জন্য জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারের তাগিদ এবং জনস্বাস্থ্য বিষয়ক প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে একটি যৌথ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সেবা দল গঠনের সুপারিশ করা হয়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক এলাকাগুলোতে মার্কিন কোম্পানির আরো বেশি সরাসরি বিনিয়োগের আহ্বানও পুনর্ব্যক্ত করা হয় সর্বশেষ বৈঠকে। তাতে প্রতিযোগিতামূলক অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি এবং বীমা বাজার উদারীকরণের মতো চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে কথা হয়। উভয় পক্ষই তুলা ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের স্থিতিশীল দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে আগ্রহ ব্যক্ত করে। বাণিজ্য ও যোগাযোগ ত্বরান্বিতকরণে নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ ইন্টারনেটের গুরুত্ব বিষয়ে সেখানে কথা হয়। সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতিতে সহযোগিতা বৃদ্ধির আলোচনায় আশাবাদ ব্যক্ত করা হয় যে, উভয় সরকার জ্ঞান, উপাত্ত ও নতুন ধারণা, বৃহত্তর সক্ষমতা সৃষ্টি এবং পেশাগত সহযোগিতা জোরদারকরণের মাধ্যমে একটি সমন্বিত সমুদ্রভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গঠনের লক্ষ্যে একত্রে কাজ করবে। বাংলাদেশ পক্ষ আশা করে যে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে কৃত্রিম উপগ্রহ ভিত্তিক মৎস্য শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং মৎস্য/সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি প্রদান করবে। জ্বালানি ও বাংলাদেশের উজ্জ্বলতর ভবিষ্যৎ নিশ্চিতকরণ বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ ওপেন স্কাইস এয়ার ট্রান্সপোর্ট চুক্তি নিয়ে কথা হয়। দেশটির ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশন অথরিটির মধ্যে অব্যাহত ইতিবাচক যোগাযোগে গুরুত্বারোপ করা হয়। বলা হয়, আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন নিরাপত্তা মূল্যায়ন কর্মসূচিতে বাংলাদেশকে ক্যাটাগরি-১’ এ অবস্থান ফিরে পেতে সহায়তা করবে যুক্তরাষ্ট্র। প্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের দাবি যুক্তরাষ্ট্রে বিমানের সরাসরি ফ্লাইট এবং বিরতিহীন যাত্রীসেবা পুনরায় চালুর বিষয়ে ক্যাটাগরি-১ এ ফেরার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উড্ডয়ন নিরাপত্তার প্রসঙ্গও ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকের আলোচ্য। সেখানে বিমান এবং বোয়িং-এর মধ্যে দীর্ঘকালীন অংশীদারিত্বের কথাও উল্লেখ করা হয়। সেগুনবাগিচা বলছে, সুনির্দিষ্টভাবে এক বা একাধিক ইস্যু নয়, মার্কিন উপ-পররাষ্ট্র মন্ত্রীর ঢাকা সফরে সার্বিক সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2019 doinikprovateralo.Com
Desing & Developed BY Md Mahfuzar Rahman