বিশ্ব মোড়লের খেতাব হারালো আমেরিকা!

বিশ্ব মোড়লের খেতাব হারালো আমেরিকা!

বিশ্ব মোড়ল কোনো পদ নয়, বরং অদৃশ্য স্বীকৃতি। বিশ্বের সুপারপাওয়ার দেশগুলোর মধ্যে আমেরিকার অবস্থান সবার উপরে। এমনটাই ভাবা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। বিশ্ব মোড়ল হিসেবে অলিখিত স্বীকৃতিও পেয়ে আসছিল দেশটি। তবে করোনাভাইরাস মহামারির ঝড়ে বিধ্বস্ত আমেরিকার শক্তি নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন উঠছে। করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর রেকর্ড গড়ে বিশ্বকে ‘হতবাক’ করে দিয়েছে পশ্চিমা এই মোড়ল দেশ।

মূলত, আমেরিকা সারাবিশ্বের মোড়ল হতে গিয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে শুধু যুদ্ধ আর মারণাস্ত্রের পেছনে। ঠুনকো কারণে যেকোনো দেশে হামলা চালিয়ে যুদ্ধ-সংঘাত সৃষ্টি করে তা বাণিজ্যে রূপ দেয়। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মারার মতো যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে দেশটির। তবে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস ঠেকাতে তেমন কোনো সক্ষমতা দেখা যাচ্ছে না দেশটির। মানুষ মারার যত সক্ষমতা আছে তাদের, মানুষ বাঁচানোর তত সক্ষমতা যে নেই সেটাই এবার প্রমাণ হয়েছে।

করোনা মহামারীতে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হওয়া সুপারপাওয়ার আমেরিকার স্বাস্থ্য বিভাগের এমন নাজুক দশা করো কল্পনাতেও ছিল না। তবে ভয়াবহ এই সংকট কীভাবে কাটিয়ে উঠবে তা নিয়ে দৃশ্যমান কোনো পরিকল্পনাও নেই দেশটির। বলা হচ্ছে, আমেরিকায় এই দুর্যোগে সঠিক নেতৃত্ব দেয়ার মতোও কেউ নেই। সংকটকে গভীরভাবে উপলব্ধি করে কারো ঘাড়ে দোষ না চাপিয়ে উত্তোরণের পথ বের করার মতো সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে আমেরিকায়।

যদিও করোনাঝড়ে লণ্ডভণ্ড আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চড়া গলা এখন আরো বাজখাই হয়ে গেছে। দোষ চাপানোর রাজনীতিতে মেতে উঠেছেন। করোনাভাইরাস চীনের ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা হয়েছে- এমন অভিযোগ তুলেছেন। আর ট্রাম্পের এমন তত্ত্বে বিশ্বাস না করায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুদানও বন্ধ করে দিয়েছেন। পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ হয়ে এখন চীনের বিরুদ্ধে মামলাও করেছেন। এরপর ঘোষণা দিয়েছেন, প্রাণহানি যা-ই হোক লকডাউন তুলে নেবেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এসব অদ্ভুত কথাবার্তা আর পদক্ষেপে তার মোড়লিপনার প্রকাশ ঘটে বটে, তবে বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়। বরং করোনা মহামারি প্রতিরোধে বিশ্বের অন্যসব দেশ আর ইউরোপের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে আমেরিকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটার একমাত্র কারণ হচ্ছে সঠিক সময়ে সঠিক নেতৃত্বের অভাব। অর্থাৎ বলা হচ্ছে, করোনার ছোবলে নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েছে আমেরিকা। আর তাতে বিশ্ব মোড়ল খেতাব হারানোর বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট।

প্রখ্যাত লেখক ও ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়া হারারি আমেরিকার মোড়লিপনা নিয়ে মন্তব্য করেছেন, আমেরিকা অনেক দিন ধরেই বিশ্বের নেতৃস্থানে নেই। এমনকি এখন নেতৃস্থানে থাকার ক্ষমতাও হারিয়েছে। তিনি প্রশ্ন করেছেন, করোনা-আক্রান্ত বিশ্বকে পথ দেখাচ্ছে কে ইতালি না আমেরিকা? এমন প্রশ্ন করলে উত্তর আসবে ইতালি।

ট্রাম্প কতটা ক্ষুদ্র মানসিকতা আর অপরাজনীতির পোষক তা তার কথাবার্তা আর কর্মকাণ্ডেই প্রমাণ হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন সতর্কবার্তা দিয়ে বললো, করোনা মহামারির দুর্যোগে রাজনীতিকে না টানতে তখন সেটা ট্রাম্প লুফে নিলেন। অনুদান বন্ধ করে দিলেন। আর করোনা ঠেকাতে স্বাস্থ্য বিভাগের নাজেহাল অবস্থার জন্য দায়ী করলেন আগের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে।

ট্রাম্প কার্টুন। ছবি: সংগ্রহ।

বিশ্ব মোড়ল কোনো দেশের শীর্ষ নেতাকে এমন অতি ক্ষুদ্র স্বার্থ গ্রাস করলে তার ফল হয় ভয়াবহ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুদান বন্ধ করে তারই প্রমাণ রাখলেন ট্রাম্প। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের এই অবস্থানকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ বলছেন। করোনা মহামারির এই ভয়াবহ দিনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অতিরিক্ত ৬০ কোটি ডলার প্রয়োজন ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনুদান বন্ধ না করলে এই অর্থের সংস্থান হতো। বিশ্বের কোটি কোটি অসহায় লোকদের বাঁচানোর জন্য মাস্ক বা টেস্টিং কিটের দ্রুত ব্যবস্থা হতে পারতো। কিন্তু ট্রাম্পের অমানবিক সিদ্ধান্তে ভয়াবহ ঝুঁকি আরো বাড়লো।

ভূরাজনীতিকে হাতের মুঠোয় রাখতে গোটা বিশ্বের রাষ্ট্রনায়কদের উপদেশ দিয়ে বেড়ানো মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিয়ে সত্যিই সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে। সত্যিই কি বিশ্ব শাসনের কল্যাণকর মানবিক সক্ষমতা আছে আমেরিকার? বিশ্ব মোড়ল হওয়ার মতো যোগ্যতাও কি আছে তাদের? এক মাত্র ট্রাম্পের কারণেই বিশ্ব মোড়ল খেতাব হারাতে বসেছে আমেরিকা। এই ধাক্কা থেকে উঠে দাঁড়ানো সত্যিই কঠিন আমেরিকার জন্য। তবে আমেরিকার পর কে হবেন মানবিক বিশ্বের মোড়ল দেশ? এমন প্রশ্নের উত্তর পেতে আরো অপেক্ষা করতে হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2019 doinikprovateralo.Com
Desing & Developed BY Md Mahfuzar Rahman