রিফাত হত্যায় ৬ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

রিফাত হত্যায় ৬ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

বরগুনার বহুল আলোচিত শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ৬ জনের মৃত্যুদন্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এছাড়া এ মামলায় ৪ জনকে খালাস প্রদান করা হয়েছে। বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুর পৌনে ২টার দিকে এ মামলার রায় ঘোষণা করেন বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান।

আলোচিত এ হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ড প্রাপ্তদের পুলিশের দেয়া অভিযোগপত্রে ১নং আসামি রাকিবুল হাসান রিফাত ওরফে রিফাত ফরাজী বরগুনা পৌর শহরের ধানসিড়ি সড়কে আহসান হাবিব দুলাল ওরফে দুলাল ফরাজীর ছেলে। তাকে গত ৩ জুলাই ২০১৯ গ্রেপ্তার করে পুলিশ আদালতে সোপর্দ করে।

রিফাত শরীফকে হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকারী এই রিফাত ফরাজী। নয়ন বন্ডের ঘনিষ্ঠ সহচর রিফাত ফরাজীর বিরুদ্ধে অভিযোগ- সে এলাকায় ছিচকে চুরি থেকে শুরু করে বরগুনায় অবস্থানরত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের ম্যাচে হানা দিয়ে মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে মারধর করে অর্থ আদায় করতো।

২০১৯ সালে মার্চ মাসে ‘বন্ড ০০৭’ নামের একটি ম্যাসেঞ্জার গ্রুপ খুলে সদস্য যুক্ত করতে থাকে। রিফাত শরীফকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার আগের রাতে এই ফেসবুক গ্রুপেই হত্যার সর্বশেষ নির্দেশনা দেয় রিফাত ফরাজী। সেখানে গ্রুপের সবাইকে ২৬ জুন বুধবার সকাল ৯টার মধ্যে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে আসার নির্দেশনা দেয়া হয়। মোহাম্মদ নামে এক জনকে সকাল ৯টায় আসার সময় রামদা নিয়েও আসতে বলে সে। রিফাত শরীফ কলেজ থেকে বের হওয়ার পর পরিকল্পনা মোতাবেক তাকে প্রথম কলার ধরে রিফাত ফরাজী।

এরপর নয়ন বন্ডের হাতে দিয়ে সে দৌড়ে দুহাতে দুটি রামদা নিয়ে এসে প্রথম কোপাতে শুরু করে। পুলিশ কর্মকর্তার বাড়িতে হামলা-ভাংচুর, ব্যাংক কর্মকর্তার ছেলেকে কুপিয়ে জখমসহ তার বিরুদ্ধে রিফাত শরীফ হত্যা মামলার আগেও ভাংচুর, চাঁদাবাজি, ছিনতাই এবং মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে মোট ৮টি মামলা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে এসব মামলায় বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তারও হয় সে। তবে প্রতিবারই আদালত থেকে জামিন নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আবারও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। ধানসিঁড়ি রোড, কেজি স্কুল রোড এবং ডিকেপি রোডের বাসিন্দারা তার হেন কর্মকান্ডে ভীত এবং অন্যদিকে অতিষ্ঠ ছিল বলে অভিযোগ। রিফাত ফরাজীর বিরুদ্ধে হত্যাকান্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে ৩৪ ও ৩০২ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।

২নং আসামি রাব্বি আকন বুড়িরচর ইউনিয়নের পশ্চিম কেওড়াবুনিয়া এলাকার ৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবুল কালামের ছেলে। বন্ড গ্রুপের অন্যতম সদস্য রাব্বি আকন বন্ড গ্রুপের প্রধান নিহত নয়ন বন্ড এর সেকেন্ড ইন কমান্ড রিফাত ফরাজীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। রিফাত শরীফ হত্যার পরিকল্পনায় ও ঘটনাস্থলে সক্রিয় ভূমিকায় ছিল রাব্বি আকন।

ঘটনার আগের দিন ২৫ জুন রিফাত শরীফকে হত্যার বিষয়টি রিফাত ফরাজী মোবাইলে রাব্বি আকনকে জানায়। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৮টায় রিফাত শরীফ কলেজে রওয়ানা করলে রাব্বি আকন মোবাইলে খবরটি রিফাত ফরাজীকে জানায়। সকাল সোয়া ৯টায় সে কলেজে প্রবেশ করে এবং সাইন্স বিল্ডিংয়ের পাশে রিফাত ফরাজী, রিফাত হাওলাদারসহ অন্যদের সাথে হত্যার পরিকল্পনায় অংশ নেয়।

পরবর্তীতে রিফাত শরীফ কলেজ থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে তাকে ঘিরে ধরে মারধর করতে করতে নয়ন বন্ডের হাতে তুলে দেয়। হত্যার সময় যাতে পালাতে না পারে অন্য আসামিদের সাথে রাব্বি আকনও রিফাত শরীফকে ঘিরে রাখে। এছাড়াও হত্যা পরবর্তী সময়ে নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীর সাথে একাধিকবার তার মোবাইলে কথোপকথনের প্রমাণ আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশ। হত্যাকান্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে ৩৪ ও ৩০২ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। চার্জ গঠনের পর রাব্বি আকন আদালতে আত্মসমর্পণ করে।

৩নং আসামি মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত বন্ড গ্রুপের অন্যতম সদস্য। সিফাত ঘটনার আগের দিন ২৫ জুন বিকেলে বরগুনা সরকারি কলেজে রিফাত শরীফ হত্যা পরিকল্পনার মিটিংয়ে উপস্থিত ছিল। পরিকল্পনা মোতাবেক রিফাত শরীফ কলেজ থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে অন্যদের সাথে সিফাতও তাকে ঘিরে ধরে এবং রিফাত ফরাজীর সাথে রামদা আনার জন্য দৌড়ে যায়। পরে ফিরে এসে রিফাত ফরাজীর ও নয়ন বন্ড রিফাত শরীফকে এলোপাতাড়ি কোপানোর সময় নিহত রিফাতকে ঘিরে রাখে। সিফাত বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার রায়হানপুর ইউনিয়নের লেমুয়া গ্রামের দেলোয়ার হোসেন ওরফে আর্মি দেলোয়ারের ছেলে। বরগুনা পৌরসভার কলেজিয়েট স্কুল এলাকায় বাবা মার সাথে বসবাস করত। তার বিরুদ্ধে ও এর আগে বরগুনা থানায় তিনটি মামলা রয়েছে। রিফাত শরীফ হত্যাকান্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাতের বিরুদ্ধে ৩৪ ও ৩০২ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। ১ জুলাই ২০১৯ তারিখে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

৪নং আসামি রেজোয়ান আলী খান ওরফে টিকটক হৃদয় বরগুনা সদরের বদরখালী ইউনিয়নের কুমড়াখালী চালিতাতলা এলাকার বাসিন্দা রফিক আলী খান ওরফে রকীবের ছেলে হৃদয়। হত্যকান্ডের সময় টিকটক হৃদয় আসামি রিফাত ফরাজীর সাথে ঘটনাস্থল রেকি করতে থাকে। রিফাত শরীফ কলেজ থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে তাকে অন্যরা ঘিরে ঘরে টানতে টানতে সামনে নিয়ে যাওয়ার সময় টিকটক হৃদয় দৌড়ে রিফাত ফরাজীর সাথে কলেজের পূর্ব দিকে রাখা দা আনতে যায় এবং ফিরে এসে রিফাত শরীফকে ঘিরে রাখে। ১ জুলাই ২০১৯ তারিখে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে হত্যার পরিকল্পনা ও সরাসরি অংশ নেয়ার অভিযোগে ৩৪ ও ৩০২ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।

৫নং আসামি হাসান বরগুনা সদর উপজেলার ২নং গৌরীচন্না এলাকার বাসিন্দা আয়নাল হকের ছেলে। বরগুনা পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডে কলেজ সড়কে তালুকদারের বাড়িতে পরিবারের সাথে ভাড়া থাকতো হাসান। রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের সময় হাসান ঘটনাস্থল রেকি করা ও রিফাত শরীফ বের হওয়ার পরপরই অন্যদের সাথে টেনে হিচড়ে নিয়ে কোপানোর সময় ঘিরে রাখার অভিযোগ হাসানের বিরুদ্ধে । ১ জুলাই ২০১৯ তারিখে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে হত্যার পরিকল্পনা ও সরাসরি অংশ নেয়ার অভিযোগে ৩৪ ও ৩০২ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।

হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও হত্যার কারণ হিসেবে ৭ নং আসামি ও রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির নাম অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

বরগুনা পৌরশহরের ওয়ার্ডের কড়ইতলা মাইঠা এলাকার মোজাম্মেল হোসেন কিশোরের বড় মেয়ে মিন্নি। পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র এবং সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে মিন্নির বিরুদ্ধে। রিফাত শরীফকে হত্যার মূল কারণ হিসেবে, রিফাত শরীফের সাথে বিয়ে পরবর্তী নয়ন বণ্ডের সাথে মিন্নির সম্পর্কে সৃষ্ট বিরোধিতার জেরেই রিফাতকে হত্যার পরিকল্পনা করে মিন্নি ও নয়ন বন্ড এমনটি উল্লেখ করা হয়েছে।

বিবরণীতে বলা হয়, প্রথমে মিন্নি নয়নকে বিয়ে করে। বিষয়টি গোপন রেখে ফের রিফাত শরীফকে বিয়ে করে মিন্নি এবং নয়ন বন্ডের সাথে গোপনে যোগাযোগ ও বাসায় যাতায়াত অব্যাহত রাখে। এ নিয়ে রিফাত শরীফের সাথে মিন্নির দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। সবশেষ হেলাল নামের এক যুবকের কাছ থেকে রিফাত শরীফের মোবাইল কেড়ে নেয়া থেকে নয়নের সাথে রিফাতের দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত রূপ নেয় এবং সব মিলিয়ে মিন্নি ও নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীসহ অন্যরা আগের দিন বিকেলে সরকারি কলেজের শহীদ মিনারের কাছে গোপন বৈঠক করে রিফাত শরীফকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়াও অভিযোগপত্রে রিফাতকে নয়ন বন্ড কুপিয়ে জখম করার পরও মোবাইলে যোগাযোগ ও নয়ন বন্ডের সাথে মোবাইলে ম্যাসেজ দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে মিন্নির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিপরীতে নয়ন বন্ডের মায়ের নামে নিবন্ধিত একটি সিম গোপনে মিন্নি ব্যবহার করত এমন অভিযোগ এনে ওই নম্বরের সাথে নয়ন বন্ডের বিভিন্ন সময়ে কল লিস্ট ও কল ডিটেইলস জমা দিয়েছেন। এছাড়াও আলামত হিসেবে নিহত নয়ন বন্ডের বাসা থেকে জব্দ স্যালোয়ার কামিজ, আই ভ্রু, মিন্নির ছবি, মাথা আচড়ানো চিরুনি, চিরুনিতে পেচানো নারীদের চুল জমা দেয়া হয়েছে। অভিযোগপত্রের বিবরণীতে অধিকাংশ জায়গায় মিন্নির বিরুদ্ধে রিফাত হত্যায় ষড়যন্ত্রের কথা বলা হয়েছে।

এ মামলায় গত বছরের ১৬ জুলাই মিন্নি গ্রেপ্তার হয়, ২৯ আগস্ট ২০১৯ তারিখে মিন্নির জামিন মঞ্জুর করে উচ্চ আদালত এবং ৪৯ দিন পর কারাগার থেকে মুক্ত হন মিন্নি। মামলার একমাত্র জামিনে থাকা আসামি আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির বিরুদ্ধেও হত্যার পরিকল্পনা ও সরাসরি অংশ নেয়ার অভিযোগে ৩৪ ও ৩০২ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।

এ মামলার রায় দেয়ার পর মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর সাংবাদিকদের বলেন, আমরা আদলতে সঠিক রায় পাইনি। আমরা এটা নিয়ে উচ্চ আদালতে আপিলে যাবো।

অপরদিকে রায় নিয়ে সন্তুষ্ট প্রকাশ করেছে রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ। খালাসপ্রাপ্তদের নিয়ে রিফাতের পিতা দুলাল শরীফ বলেন, আদালত যাদের খালাস দিয়েছেন,তাদের রিফাত হত্যায় যোগসূত্র পাওয়া যায়নি বলেই হয়তো খালাস দিয়েছেন। আমরা এই রায়ে সন্তুষ্ট।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2019 doinikprovateralo.Com
Desing & Developed BY Md Mahfuzar Rahman