শত দেশে ছড়াল করোনা

শত দেশে ছড়াল করোনা

১০২টি দেশ ও অঞ্চলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়াল। গত ডিসেম্বরের শেষের দিকে চীনের উহানে প্রথম এই ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল। আড়াই মাসের কম সময়ের মধ্যে বিশ্বের অর্ধেক দেশে সংক্রমণ শনাক্ত হলেও বাংলাদেশ এ তালিকার বাইরে আছে। তবে যেকোনো সময় বাংলাদেশে রোগী শনাক্ত হওয়ার খবর পাওয়া যেতে পারে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা বলেছেন, পৃথিবীর অনেক দেশেই করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। সব সময় প্রস্তুত থাকা দরকার। যেকোনো সময় আক্রান্ত দেশ থেকে যাত্রীদের মাধ্যমে করোনা দেশে আসতে পারে।

গতকাল শনিবার দুপুরে নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে আইইডিসিআরের পরিচালক এ কথা বলেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, দেশে ১১১ জনের নমুনা (মুখ ও নাকের লালা) পরীক্ষা করা হয়েছে। এখনো কেউ শনাক্ত হয়নি। গতকাল সন্ধ্যায় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আইইডিসিআর জানিয়েছে, ৪৮ জন ব্যক্তি বিভিন্ন হাসপাতালে ‘আইসোলেশন’ ও ‘কোয়ারেন্টাইনে’ আছেন। এঁদের কেউ কেউ আক্রান্ত দেশ থেকে এসেছেন।

এদিকে করোনা প্রতিরোধে বাংলাদেশসহ সাতটি দেশের সঙ্গে বিমান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে কুয়েত। দেশটির সিভিল এভিয়েশন বিভাগ গত শুক্রবার এ নির্দেশনা দেয়। আগামী এক সপ্তাহ এসব দেশের সঙ্গে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকবে।

গতকাল ছুটির দিন থাকলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সন্ধ্যা পর্যন্ত আইইডিসিআরে সভা করেছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সূত্র বলেছে, সভাটি হয়েছে মূলত করোনা প্রতিরোধের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে। করোনা প্রতিরোধ সরঞ্জাম কেনাকাটা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার প্রস্তুতি এবং চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের বিষয়গুলো সভায় গুরুত্ব পেয়েছে। 

সরকার ইতিমধ্যে একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেককে প্রধান করে জাতীয় পর্যায়ে ৩১ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটির কোনো বৈঠক হয়নি। জেলা প্রশাসককে প্রধান করে জেলা কমিটি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রধান করে উপজেলা পর্যায়ে কমিটি করা হয়েছে। রাজধানীর বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালকে করোনার জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে পৃথক করোনা ইউনিট করার কথা বলেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

আইইডিসিআর বলেছে, যেকোনো সময় করোনা দেশে আসতে পারে। কুয়েতের ফ্লাইট সাত দিনের জন্য বন্ধ।

প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, আফগানিস্তানে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর দেশে উদ্বেগ বাড়ছে। জনবহুল এই দেশে সংক্রমণ দেখা দিলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় আছে মানুষ। প্রতিদিন সাধারণ মানুষ গণমাধ্যমের কর্মীদের কাছে এ বিষয়ে নানা প্রশ্ন করছেন। আইইডিসিআরেও প্রতিদিন বহু মানুষ এ ব্যাপারে ফোন করছেন। আইইডিসিআর বলছে, গতকাল ১৫৬ জন ফোন করেছিলেন শুধু ‘কোভিড ১৯’ সম্পর্কে জানতে।

চীনসহ যেসব দেশে করোনার সংক্রমণ দেখা দিয়েছে, সেসব দেশে বহু বাংলাদেশি আছেন। ইতিমধ্যে সিঙ্গাপুর, ইতালি ও আবর আমিরাতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা আক্রান্ত হয়েছেন। প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশি যাঁরা বাংলাদেশে আসছেন, তাঁদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হচ্ছে সমুদ্র, স্থল ও বিমানবন্দরে। তবে সব ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য পরীক্ষা যথাযথ হচ্ছে না বলে নানা খবর বের হচ্ছে।

বিশ্ব পরিস্থিতি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্য রাষ্ট্র ১৯৪টি। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত বিশ্বের ১০১ দেশ ও অঞ্চলে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার তথ্য এসেছে। আক্রান্ত হয়েছে লক্ষাধিক মানুষ। এই তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সিস্টেমস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের। প্রতিষ্ঠানটি করোনা পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রেখে চলেছে। বিবিসি বলছে, সার্বিয়া, স্লোভাকিয়া, পেরু ও টোগো—সর্বশেষ এই ৪টি দেশে করোনা-আক্রান্ত মানুষ শনাক্ত হয়েছে।

ইতালিতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ২৪ ঘণ্টায় আরও ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে বিবিসি জানিয়েছে। এই নিয়ে দেশটিতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১৯৭। আর এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ৪ হাজার ৬০০ জনের বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রেও আক্রান্ত ও মৃত্যু বেড়ে চলেছে। গতকাল পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয় ২০০ এবং মৃত্যু ১৬।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব অনুয়ায়ী ২৬টি দেশে শনাক্ত করা রোগীর সংখ্যা একজন করে। তবে একজন রোগী শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত অন্যরা আক্রান্ত হওয়ার নজির ইতিমধ্যে একাধিক দেশে দেখা গেছে।

করণীয়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নয়, সামগ্রিকভাবে সরকারকে করোনা প্রতিরোধে উদ্যোগী হতে হবে। প্রতিটি রাষ্ট্রকে করোনাবিষয়ক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে।

আইইডিসিআর সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেছে, আক্রান্ত দেশ থেকে আসা ব্যক্তি যেন গণপরিবহন ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করেন।

কুয়েতের ফ্লাইট আপাতত বাতিল

কুয়েতের সিভিল এভিয়েশন বিভাগ জানিয়েছে, বাংলাদেশ, মিসর, ভারত, সিরিয়া, লেবানন, শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনের সঙ্গে কুয়েতের ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করা হয়েছে।

ঢাকা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও কুয়েত এয়ারওয়েজের সরাসরি ফ্লাইট রয়েছে। এর মধ্যে কুয়েত এয়ারওয়েজের ফ্লাইট রয়েছে সপ্তাহে ১২টি।

কুয়েত এয়ারওয়েজ সূত্রে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞাকালীন যাঁদের টিকিট রয়েছে, তাঁরা টাকা ফেরত চাইলে সেটি দেওয়া হবে।

বিমান বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোকাব্বির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশ বিমানের তিনটি ফ্লাইট প্রতি সপ্তাহে কুয়েতে যায়। বিমানের কুয়েত ফ্লাইটের বেশির ভাগ যাত্রী শ্রমিক। তাঁদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে। তিনি বলেন, সাত দিনের জন্য ফ্লাইট বাতিল করেছে কুয়েত। আমরা আপাতত দুটি ফ্লাইট (৭ ও ১০ মার্চ) বাতিল করেছি।’

বাতিল করা ফ্লাইটের যাত্রীদের জন্য কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এই প্রশ্নের উত্তরে মোকাব্বির হোসেন বলেন, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। দু-এক দিনের মধ্যে এ বিষয়ে জানানো হবে।

বিমান জানিয়েছে, গতকাল বিমানের ফ্লাইটে কুয়েতগামী যাত্রী ছিলেন ২৫৯ জন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2019 doinikprovateralo.Com
Desing & Developed BY Md Mahfuzar Rahman