সৌদিতে প্রাণ হারিয়েছেন ৬৮ বাংলাদেশি

সৌদিতে প্রাণ হারিয়েছেন ৬৮ বাংলাদেশি

যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের পর করোনায় সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে সৌদি আরবে। দেশটিতে এ পর্যন্ত ৬৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে প্রাণঘাতী করোনায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করোনা বিষয়ক সেল রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস এবং   জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেটের দেয়া রিপোর্টে এ তথ্য দেয়া হয়েছে। যার একটি কপি পেয়েছে মানবজমিন। এতে উল্লেখ রয়েছে, মদিনায় মারা গেছেন ৩৪ জন বাংলাদেশি। যা সবচেয়ে বেশি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মারা গেছে মক্কায়। সেখানে ২৪ জনের মৃত্যু   হয়েছে।

জেদ্দায়  মারা গেছে ১০ জন। হিসাব বলছে, সৌদি আরবে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ২৪ জনই চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা। এক জেলার এত প্রবাসী মারা যাওয়ার ঘটনায় হতভম্ব সৌদিস্থ চট্টলা কমিউনিটি। শোকের ছায়া নেমে এসেছে তাদের মধ্যে। এর পরেই কক্সবাজারের অবস্থান। চট্টগ্রাম বিভাগের ওই জেলার আট জন বাসিন্দা মক্কা ও মদিনায় করোনায় প্রাণ হারিয়েছেন।

তাছাড়া কুমিল্লার পাঁচ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চার জন, নোয়াখালীর তিন জন, চাঁদপুরের তিন জন, ঢাকার দুই জন, মানিকগঞ্জের দুই জন, টাঙ্গাইলের দুই জন, লক্ষ্মীপুরের দুই জন, রবিশালের দুই জন, ভোলার দুই জন এবং নড়াইলের এক জন, নরসিংদীর এক জন, বগুড়ার এক জন, খুলনার এক জন, বরগুনার এক জন, পাবনার এক জন, ফেনীর এক জন, পটুয়াখালির এক জন এবং সিলেটের এক জন বাসিন্দা মারা যাওয়ার তথ্য রয়েছে।
বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা : চারদিন আগে সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ জানিয়েছেন, সৌদিতে আক্রান্তের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। সৌদি সরকারের হিসাবে ২৬০০ বাংলাদেশির করোনা শনাক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্ত অনানুষ্ঠানিক সূত্রে এ সংখ্যা সাড়ে ৩ হাজারের বেশি হবে বলে ধারণা বাংলাদেশ মিশনের। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করোনা সেল বলছে, সৌদি সরকার এখন আর করোনা আক্রান্ত বিদেশিদের নাগরিকত্ব প্রকাশ করছেন না। গত এক সপ্তাহ ধরে কোনো হিসাবই দিচ্ছে না। তবে বাংলাদেশের দুটি মিশন নিজস্ব অনুসন্ধানে যে রিপোর্ট পাঠাচ্ছে তাতে আক্রান্ত বাংলাদেশির সংখ্যা চার হাজারের কম নয় বলে ধারণা দেয়া হয়েছে। এ-ও বলা হয়েছে এটি প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

সৌদিতে বাংলাদেশিদের জীবন, জীবিকা দুটোই সঙ্কটে : মিশনের সব রিপোর্ট বলছে, সৌদিতে বাংলাদেশিদের জীবন, জীবিকা দুটোই এখন সঙ্কটে। করোনা আক্রান্তদের মৃত্যুর হারে বাংলাদেশি এগিয়ে থাকা নিয়ে সংশয় পিছু ছাড়ছে না। আরও অন্তত ২০ জন বাংলাদেশির অবস্থা সংকটাপন্ন। তবে যারা সুস্থ, রোগ-শোক থেকে মুক্ত তারা জীবিকা নির্বাহ নিয়ে শঙ্কিত। মধ্যপ্রাচ্যের বড় ওই শ্রমবাজারে প্রায় ২২-২৫ লাখ বাংলাদেশির বাস। যাদের ৮৫ ভাগই বৈধ। তাদের বতাকা বা পরিচয়পত্র, নিয়োগপত্র থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব ডকুমেন্ট রয়েছে। তারা নিয়মিত এবং বেশ ভাল বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। কিন্তু আচমকা  সৌদি নাগরিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিতে নেয়া (সৌদিকরণের) সরকারি সিদ্ধান্তে আজ বিদেশি শ্রমিকদের গণহারে ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সৌদিকরণের এ সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন না এলে (চূড়ান্ত পর্যায়ে) নূন্যতম কী পরিমাণ বাংলাদেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন? তার একটি অনুমান সংক্রান্ত রিপোর্ট ঢাকায় পাঠিয়েছে রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস। ওই রিপোর্টে ধারণা দেয়া হয়েছে, আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৫ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক চাকরি হারাতে পারেন। দূতাবাসের রিপোর্টে বিস্তারিত জানিয়ে বলা হয়েছে, সৌদিকরণের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ভিশন-২০৩০ ঘোষণা করেছে রিয়াদ। যেখানে বলা হয়েছে, ওই সময়ের মধ্যে দেশটির চাকরির বাজারের ৭০ শতাংশ নাগরিকদের অধিকারে নিতে হবে। এ জন্য ধীরে ধীরে ওই বাজার থেকে বিদেশি বা অভিবাসী শ্রমিকের বিদায় করতে হবে। সৌদি আরব সরকার গৃহীত ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া গেল বছরের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে জানিয়ে বলা হয়, করোনার কারণে এটি থমকে গেছে। তবে করোনা নিয়ন্ত্রণে আসার পরপরই এটি ফের শুরু হবে এতে কোনো সংশয় নেই।

রিয়াদে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ সৌদি শ্রমবাজারে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা সংক্রান্ত রিপোর্ট ঢাকায় পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে মানবজমিনের সঙ্গে আলাপে রাষ্ট্রদূত দাবি করেন, যেভাবে প্রচার করা হচ্ছে ঘটনা তা নয়। সৌদিকরণের এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে করোনার কোনো সংযোগ নেই। তাছাড়া এটা ওভারনাইট হয়ে যাচ্ছে, তা-ও নয়। সৌদি সরকার বাংলাদেশিদের টার্গেট করে চাকরিচ্যুত করছে এবং দেশে ফেরতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিষয়টি এমনও নয়। মূল কথা হচ্ছে, তারা বিদেশি শ্রমিক কমিয়ে চাকরির বাজারে নিজেদের লোকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে চায়। মোট চাকরির ৭০ ভাগ পর্যন্ত সৌদি নাগরিকদের নিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পর্যায়ক্রমে তারা তা বাস্তবায়ন করছে। রাষ্ট্রদূত বলেন, এখনই তাদের ফেরানোর কোনো চাপ নেই। তবে পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে চাপে পড়তে সময় লাগবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রাষ্ট্রদূত কোন রকম রাখঢাক না করে বলেন, বিপদ চারদিক থেকে আসছে। বৈধদের চাকরিচ্যুতির দখল সামলাতে হয়তো তিন থেকে পাঁচ বছর সময় মিলবে। কিন্ত দেশটিতে থাকা আড়াই থেকে তিন লাখ আন-ডকুমেন্টেড বা অনিয়মিত বাংলাদেশি রয়েছেন। তারা হয়তো বৈধভাবেই দেশটিতে প্রবেশ করেছেন, কিন্তু কফিল বা নিয়োগকর্তার কাজ না করে অন্যত্র কাজে যাওয়াসহ নানা কারণে তারা অনিয়মিত হয়ে পড়েছেন। করোনার এই সময়ে ওই বাংলাদেশিরা বড্ড বিপদে। তাদের বেশিরভাগেরই কাজ নেই। করোনা আসার আগে তারা মুক্তভাবে এখানে সেখানে কাজ করতেন। গাড়ি ধোয়া, ফুটফরমাশ খাটতেন। কিন্তু তারা কোনো কোম্পানী, কফিল বা নিয়োগকর্তার অধীনে ছিলেন না। যেমনটি নিয়মিত শ্রমিকদের বেলায় রয়েছে। বৈধ শ্রমিকরা যে কোম্পানীতে বা  কফিলের অধীনে কাজ করেন তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে সেখানেই। অনিয়িমিতদের সেই সুবিধা নেই। ফলে তারা এখন অর্থ এবং খাদ্য কষ্টে। করোনা উত্তরণের পরপরই অনিয়মিত বা অবৈধ বাংলাদেশিদের বড় অংশকে নিজে থেকেই হয়তো দেশে ফিরতে হবে। এবং তা কয়েক মাসের মধ্যেই ঘটবে। উল্লেখ্য, সৌদি সরকার স্পেশাল ফ্লাইটে কারাগার বা ডিটেনশন সেন্টার থেকে মুক্ত বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠাচ্ছে। করোনাকালেও দুটি ফ্লাইট এসেছে। আরও অন্তত চার শতাধিক শ্রমিক বিমানে ওঠার অপেক্ষায় রয়েছেন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2019 doinikprovateralo.Com
Desing & Developed BY Md Mahfuzar Rahman