স্বপ্নের ঠিকানা ‘আশ্রয়ণ’

স্বপ্নের ঠিকানা ‘আশ্রয়ণ’

গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপ্টেশনের চেয়ারম্যান জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন ২০১৯ সালে অ্যাডাপ্টেশনের ঢাকা সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমরা এখানে বাংলাদেশের কাছে শিখতে এসেছি। অভিযোজনের বিষয়ে শেখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশই সবচেয়ে ভালো শিক্ষক।’ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত শেখ হাসিনা সরকারের আশ্রয়হীনদের আশ্রয় ‘আশ্রয়ণ’ শুরু হয় ১৯৯৭ সালে। ওইবছর ১৯ মে কক্সবাজারে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে বহু পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে গৃহহীন-ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসনে ‘আশ্রয়ণ’ প্রকল্প হাতে নেন। আশ্রায়ণে এ পর্যন্ত আশ্রয় পেয়েছে মোট তিন লাখ ১৯ হাজার ১৪০ পরিবার। এরমধ্যে জুন ২০১০ সাল থেকে জুন ২০২০ পর্যন্ত আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের মাধ্যমে আশ্রয় পেয়েছে দুই লাখ ১৩ হাজার ২২৭ পরিবার। আজ বৃহস্পতিবার কক্সবাজারের খুরুশকুলে ‘স্বপ্নের নীড়’ পাচ্ছে ৬০০ জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবার। গণভবন থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে এ প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্রমতে, আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পে দুই লাখ ৫০ হাজার গৃহহীন গৃহ পাবে। বাস্তবায়ন ব্যয় ধরা হয়েছে চার হাজার ৮২৬ কোটি ১৬ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। আশ্রয়ের পাশাপাশি তাদের দক্ষতা বাড়ানো, প্রশিক্ষণ ও সমবায় ঋণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহে সক্ষম করে তোলা হবে। প্রকল্পে আড়াই লাখ ভ‚মিহীন, গৃহহীন, ছিন্নমূল, অসহায় পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য তিন হাজার ৯৫০টি পাকা ব্যারাক, চরাঞ্চলে পাঁচ হাজার ৪০০ সিআই শিটের ব্যারাক, পাঁচ হাজার ২৭০টি সেমিপাকা ব্যারাক, নিজ জমিতে তিন হাজার ৭১০টি সেমিপাকা ঘর, এক লাখ ৬৬ হাজার ২৯০টি সিজিআই শিটের সিঙ্গেল ঘর, খুরুশকুলে ২০টি ছয়তলা ভবন, বিভাগীয় সদর, জেলা সদর, উপজেলা সদর, পৌরসভা এলাকায় ৫০টি বহুতল ভবন, ৯০০টি কমিউনিটি সেন্টার ও ৫৩৯টি পাকা ঘাটলা, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, ২০টি টঙ ঘর এবং ৫৮০টি বিশেষ ডিজাইনের ঘর নির্মাণ করা হবে। ১৪ হাজার ৮৯০টি অগভীর এবং এক হাজার ৩৮১টি গভীর নলক‚প স্থাপন করা হবে। কক্সবাজারে বিমানবন্দর সম্প্রসারণে সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্তদেরও পুনর্বাসন এই প্রকল্পেই।
জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ভোরের কাগজকে বলেন, একটি মানুষও গৃহহীন থাকবে না- দেশের ভূমিহীন-গৃহহীনদের বাসস্থান নিশ্চিতে এমন ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। দারিদ্র্যবিমোচনে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এটি। প্রকল্পটি সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও এসডিজির উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। প্রকল্পের মাধ্যমে ভ‚মিহীন-ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসন করে অর্থনীতির মূল স্রোতধারায় আনা হচ্ছে।
খুরুশকুলে স্বপ্নের নীড়ে ৬০০ পরিবার : সাম্পান, কোরাল, রজনীগন্ধা, গন্ধরাজ, হাসনাহেনা, কামিনী, গুলমোহর, গোলাপ, সোনালি, নীলাম্বরী, ঝিনুক, কেওড়া, মুক্তা, প্রবাল, সোপান, মনখালী, শনখালী, দোলনচাঁপা, ইনানী এবং বাঁকখালী। সাগর পাড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা মনোরম ভবনগুলোর মায়াময় নাম দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রতিটি পাঁচতলা ভবনে রয়েছে ৪৫৬ বর্গফুট আয়তনের ৩২টি করে ফ্ল্যাট। আজ স্বপ্নের নীড় বুঝে পাবে ৬০০ পরিবার।
মূলত. জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবার পুনর্বাসনের জন্য খুরুশকুল বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্প নেয়া হয় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে। কক্সবাজার সদরের খুরুশকুলে বাঁকখালী নদীর তীরে ২৫৩ একর জমিতে গড়ে উঠেছে বিশ্বের বৃহৎ এই ‘বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্প’। পুরো এলাকাকে চারটি জোনে ভাগ করে ১৩৯টি পাঁচতলা ভবন ও শেখ হাসিনা টাওয়ার নামে একটি ১০ তলা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ হলে ১০০১ টাকার নামমাত্র মূল্যে এসব ভবনে আশ্রয় পাবে কক্সবাজার বিমানবন্দরের পালে ফদনার ডেইল, কুতুবদিয়া পাড়া ও সমিতিপাড়ায় বহু বছর ধরে মানবেতর জীবন কাটানো চার হাজার ৪০৯টি পরিবার। প্রাথমিক পর্যায়ে ৬৪০ পরিবার টার্গেট করে ১০ পদাতিক ডিভিশন রামু, খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২০টি ভবনের নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করেছে। এরমধ্যে একটি ভবনের ৪৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে ১১৯টি বহুতল ভবন পৃথক ডিপিপির মাধ্যমে সশস্ত্রবাহিনী বিভাগ তৈরি করবে।
প্রকল্প পরিচালক মো. মাহবুব হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপহার হিসেবে প্রথম পর্যায়ে ৬৪০টি জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারকে একটি করে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। পুনর্বাসিত পরিবারকে ঋণ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা হবে। পাশাপাশি প্রকল্প এলাকায় আশ্রয় পাওয়া মৎস্যজীবীদের কর্মসংস্থানের জন্য আধুনিক শুঁটকি মহাল, বিক্রয় কেন্দ্র ও প্যাকেজিং শিল্পও গড়ে তোলা হবে। আশ্রয়ণ প্রকল্পটিকে মূল শহরের সঙ্গে সংযোগের জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন ব্রিজ ও সংযোগ সড়ক নির্মাণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এই প্রকল্প দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জেলা প্রসাশকের নেতৃত্বে একটি কমিটি করে দেয়া হয়েছে।
আধুনিক পর্যটন জোন : আশ্রয়ণের অন্যান্য আশ্রয়কেন্দ্রগুলো পাকা ও আধা পাকা দালানে ব্যারাক আকারে করা হলেও খুরুশকুলে বহুতল ভবনে ফ্ল্যাট পাচ্ছেন গৃহহীনরা। ভবনের প্রতি ফ্লোরে আটটি করে ইউনিট। প্রতিটি ভবনের নিচ তলা ফাঁকা রাখা হয়েছে যেখানে উপকারভোগীদের সমন্বয়ে সমিতির কার্যক্রম পরিচালিত হবে। প্রতিটি ফ্ল্যাটে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সিলিন্ডারের সুবিধা থাকবে। প্রায় ১০০ একর জমির ওপর আধুনিক পর্যটন জোন গড়ে তোলা হবে মন্তব্য করে মাহবুব হোসেন বলেন, ইতোমধ্যে ২৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সুপেয় পানির জন্য ইতোমধ্যে ১০টি গভীর নলক‚প বসানো হয়েছে। দুটি পুকুরও খনন করা হয়েছে। স্কুল তৈরি করা হয়েছে। প্রচুর তালগাছ ও ঝাউগাছ লাগানো হয়েছে। প্রকল্পে ক্লাস্টারভিত্তিক ১৪টি খেলার মাঠ, গ্রিন এরিয়া, মসজিদ, মন্দির, একটি প্রাথমিক ও একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, চারটি সাইক্লোন শেল্টার, তিনটি পুকুর, পুলিশ ফাঁড়ি, ফায়ার স্টেশন, দুটি জেটি, দুটি বৈদ্যুতিক সাব স্টেশন, দুটি বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় প্রতিটি ভবনে সোলার প্যানেল স্থাপন, রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং এবং প্রকল্প এলাকায় ঝাউবন করা হবে। পর্যটন জোন বাস্তবায়ন করবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2019 doinikprovateralo.Com
Desing & Developed BY Md Mahfuzar Rahman