হাসপাতাল নয় যেন কসাইখানা

হাসপাতাল নয় যেন কসাইখানা

সিলেট থেকে এই ব্যক্তি এসেছিলেন ঢাকা মেডিক্যালে। দালালের খপ্পরে পড়ে ঢাকা জেনারেল হাসপাতাল নামের একটি ক্লিনিকে যান। সেখানে তার একটি পা অপারেশন করে কেটে ফেলা হয়। গতকাল অভিযান চলাকালে কোনো বৈধ কাগজ দেখাতে পারেনি ক্লিনিকটি
রাজধানীসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালের সামনে ও আশপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। আর এসব প্রতিষ্ঠানগুলো দালাল নির্ভর। নিয়োজিত দালালরা সরকারি হাসপাতালের রোগীদের ভাগিয়ে নিচ্ছে। আর রোগী ভাগানোর কাজে দালালদের সহায়তা করছে সরকারি হাসপাতালের এক শ্রেণীর ডাক্তার-কর্মচারীরা। তারা কোন কোন ক্ষেত্রে নিজেরাই দালালের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন। বিনিময়ে ৫০ পার্সেন্ট কমিশন পাচ্ছেন। এদিকে ভাগিয়ে নেওয়া রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি করার পর নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। চিকিৎসা সেবার নামে তো কিছুই হয় না, উল্টো দরিদ্র রোগীদের ভিটামাটি বিক্রি করে হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে হয়।

দৈনিক ইত্তেফাকের সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
গতকাল সোমবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীসহ সারাদেশে অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অভিযানে রাজধানীতে আটটিসহ সারাদেশে অর্ধশতাধিক অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিক সিলগালা করে দেওয়া হয়। অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা সরেজমিনের চিত্র তুলে ধরে বলেন, এগুলো হাসপাতাল নয়, যেন কসাইখানা। নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। অপারেশন থিয়েটারের যন্ত্রপাতি নিম্নমানের মরিচা পড়া। কক্ষটি নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে। এই পরিবেশে রোগীর অপারেশন করলে রোগী ইনফেকশনসহ নানা জটিলতার শিকার হয়ে জীবনহানী ও অঙ্গহানি হওয়ার আশংকা বেশি বলে অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা জানান। তারা বলেন, ‘ভাবতে অবাক লাগে। এই পরিবেশে রোগীর অপারেশন কিংবা চিকিৎসা কিভাবে করে এরা?’

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের নিয়ে বাণিজ্য করে অধিকাংশ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক ও দালালরা কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। রোগী ভাগিয়ে নিয়ে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করে নানা কলা কৌশলে টাকা আদায় করেন। নামমাত্র সেবা প্রদান করে হাতিয়ে নেওয়া হয় বড় অঙ্কের টাকা। অযথা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে এবং ভর্তি থেকে শুরু করে রোগী রিলিজের দিন পর্যন্ত একাধিক বিষয়ের উপর বিল তৈরি করা হয়। কেউ যদি টাকা পরিশোধ করতে না পারেন তবে রোগী আটকে রেখে হয়রানি করা হয়।

গতকাল রাজধানীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে চারটি টিম অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিকের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। তারা আটটি অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিককে সিলগালা করে দেয়। এগুলো হলো, চাংখারপুলে ঢাকা জেনারেল হাপসাতাল, খিলগাঁও জেনারেল হাসপাতাল, সেন্ট্রাল বাসাবো জেনারেল হাসপাতাল, মাতুয়াইলে কনক জেনারেল হাসপাতাল, শনির আখড়ায় সালমান হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বকশিবাজারে খিদমাহ লাইফ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বনানীর হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট কসমেটিক সার্জারী কনসালটেন্সী এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ঢাকা পেইন এন্ড স্পাইন সেন্টার।

চানখারপুলে ঢাকা জেনারেল হাপসাতালকে কয়েক মাস আগেও সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু লাইসেন্স না নিয়েই তারা হাসপাতাল পরিচালনা করে আসছিল। একটি ফ্ল্যাট বাসায় হাসপাতালটি অবস্থিত। অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশ বিরাজ করছে। হাসপাতাল পরিচালনার নিম্নতম নীতিমালা মানা হয়নি। গতকাল অভিযানের খবর পেয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। অপারেশন করতে গিয়ে গতকাল এক রোগীর পা-কেটে ফেলেছে ডাক্তার। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যেসব রোগী আছে তার ৮০ শতাংশই দরিদ্র। হাসপাতালে সিট নেই, চিকিৎসা সেবা দেরি হবে-এসব কথা বলে দালালরা সরকারি এই হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে এর আশপাশের বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে ভর্তি করায়। পরে বেশি বিল আদায় করা হয় রোগী ও তাদের স্বজনদের কাছ থেকে। দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থা চলে আসছে। মাঝেমধ্যে র‍্যাব-পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা অভিযান চালায়, বন্ধ করে দেয়। কিন্তু অভিযানের পরে আবার তা চালু হয়ে যায়।

রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে অবস্হিত সোহরাওয়ার্দী, কিডনি ইনস্টিটিউট, মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, পঙ্গু, হৃদরোগ, চক্ষু ও নিউরোসায়েন্স হাসপাতালকে কেন্দ্র করে মোহাম্মদপুরের বাবর রোড ও এর আশপাশের অলিগলিতে গড়ে উঠেছে অনেক হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সড়কের দু’পাশে শুধু হাসপাতাল আর হাসপাতাল। আধাকিলোমিটার রাস্তায় সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৬০টি হাসপাতাল। রোগী আর দালালে গিজগিজ করে ওই এলাকা। এসব সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীদের দিকে দৃষ্টি থাকে ওই এলাকার বেসরকারি হাসপাতালগুলোর। এজন্য নিয়োগ করা হয়েছে দালাল। রোগী ধরার ফাঁদ পেতে বসে থাকে দালালরা। ওই এলাকার বেসরকারি হাসপাতালগুলোর নিজস্ব মার্কেটিং প্রতিনিধি আছে। যারা বেতন হিসেবে আবার কমিশন হিসেবে কাজ করেন। তারাই মূলত রোগী সংগ্রহের কাজ করেন এবং তাদের মার্কেটিংয়ের জন্য প্রসিদ্ধ জায়গা হচ্ছে শেরেবাংলা নগরে গড়ে উঠা বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল। মার্কেটিং প্রতিনিধিরা সকাল থেকেই সরকারি হাসপাতালে শুরু করেন জটলা। চলে গভীর রাত পর্যন্ত। এক দুই জন নয়। অন্তত কয়েকশ’ প্রতিনিধি। মিডফোর্ট হাসপাতাল, মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ও ক্যান্সার হাসপাতালের আশপাশের পরিস্থিতিও একই। আবার দালালদের মধ্যে এক শ্রেণীর রাজনৈতিক নেতাকর্মী আছেন। ইয়াবা ব্যবসায় জড়িতরাও রোগী ভাগানোর দালালি করছেন। সরকারি হাসপাতালে সব ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়। উপজেলায় ৩৩ ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়। রাজধানীর সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাহিদার শতকরা ৯৫ ভাগ ওষুধই সরবরাহ করা হয়। কিন্তু বেশিরভাগ রোগী এসব ওষুধ পান না। সরকারি হাসপাতালের আশপাশে গড়ে উঠা ফার্মেসিগুলোতে এসব ওষুধ কেনার জন্য রোগীদের হাতে ‌স্লিপ ধরিয়ে দেওয়া হয়। এর থেকে কমিশনও পান হাসপাতালের এক শ্রেণীর ডাক্তার-কর্মচারীরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, সরকারি হাসপাতালের রোগী ভাগিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার সাথে এক শ্রেণীর ডাক্তার-কর্মচারী জড়িত। এ কারণে এটা বন্ধ হচ্ছে না। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একজন নিউরো সার্জন আছেন, যাকে কোনভাবেই সরানো যাচ্ছে না। তিনি নিজেই রোগীদের পরীক্ষা কিংবা অস্ত্রোপচারের নামে বাইরের বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে পাঠিয়ে কমিশন বাণিজ্যে জড়িত। তার সম্পর্কে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবহিত বলে ওই শীর্ষ কর্মকর্তা জানান। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে কিভাবে এসব সমস্যার সমাধান হবে? রাজধানীর যে কোনো সরকারি হাসপাতালে গেলেই এদের দৌরাত্ম্য দেখতে পাওয়া যায়। তারা প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালের রোগী ভাগিয়ে বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে নিয়ে যায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিক বন্ধ করে দেওয়া হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2019 doinikprovateralo.Com
Desing & Developed BY Md Mahfuzar Rahman